Credit: Abhisek Sanwa Limbu
দীনা বেগম — নামটি আজ শুধু এক জন রাঁধুনি বা লেখিকার নয়, বরং এক সাংস্কৃতিক দূতের প্রতীক। তিনি সেই মানুষ, যিনি ব্রিটেনের মাটিতে বাংলাদেশের রান্না, স্বাদ ও ঐতিহ্যকে নতুন পরিচয়ে তুলে ধরেছেন।
বহু বছর ধরে ব্রিটেনে “বাংলাদেশি খাবার” মানে ছিল “কারি হাউসের খাবার” — যা মূলত ইংরেজদের রুচি অনুযায়ী তৈরি, আসল বাংলাদেশের ঘরোয়া রান্না নয়। দীনা বেগম এই ধারনাটি ভেঙে দিয়েছেন। তার হাত ধরে বাংলাদেশের খাবার পেয়েছে এক নতুন সম্মান, এক নতুন স্বাদ, আর এক নতুন গল্প।
শৈশব: সিলেটের শিকড় ও লন্ডনের বেড়ে ওঠা
দীনা বেগমের পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের সিলেটে। তার পরিবার ইংল্যান্ডে চলে যায় যখন তার বয়স মাত্র চার বছর। লন্ডনের বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশে বড় হলেও, তার ঘরে প্রতিদিন বাঙালিয়ানার ছোঁয়া ছিল প্রবল।
তার মা ছিলেন একজন দক্ষ রাঁধুনি, যিনি প্রতিদিন রান্না করতেন বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পদ — ভাত, ডাল, তরকারি, মাছ, পিঠা। সেই ঘ্রাণ, সেই স্বাদ, সেই পারিবারিক একাত্মতাই ছোটবেলা থেকে দীনার মনে গেঁথে যায়।
তিনি প্রায়ই বলেন,
“আমি আমার শিকড় থেকে অনেক দূরে থাকলেও, আমার রান্নার ঘ্রাণ সবসময় আমাকে বাড়ির কথা মনে করিয়ে দেয়।”
রান্নাঘরই তার কাছে ছিল এক ধরনের স্মৃতি ও ভালোবাসার জায়গা। এখান থেকেই তিনি বুঝতে শেখেন—খাবার শুধু উপকরণের নয়, এটি এক ধরনের ভাষা, যা ভালোবাসা প্রকাশ করে।
দীনা বেগম পরবর্তীকালে বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই ছোটবেলার অভিজ্ঞতাই তাকে জীবনের পথে অনুপ্রাণিত করেছে।
Read: মাচার উপকারিতা: 7 Amazing Health Secrets You Need to Know
ব্রিক লেনের গল্প: ছোট এক রাস্তা, বড় এক সংস্কৃতি
দীনা বেগম বড় হয়েছেন লন্ডনের বিখ্যাত ব্রিক লেন এলাকায়, যা আজ “লিটল বাংলাদেশ” নামে পরিচিত। এই রাস্তায় সারি সারি বাংলাদেশি দোকান, রেস্তোরাঁ, মসজিদ ও সাংস্কৃতিক সংগঠন — যেন বিদেশের মাটিতে এক টুকরো বাংলাদেশ।
ব্রিক লেন একসময় ছিল বাংলাদেশি অভিবাসীদের প্রথম আশ্রয়স্থল। এখান থেকেই ব্রিটেনে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির শুরু। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি লক্ষ্য করেন, ব্রিটিশ সমাজে “বাংলাদেশি খাবার” বলতে বোঝায় শুধু “কারি” বা “চিকেন টিক্কা মাসালা” — যা আসলে ইংরেজ স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া খাবার।
এই বাস্তবতা তাকে ভাবিয়ে তোলে। তিনি উপলব্ধি করেন, বাংলাদেশের হাজার বছরের খাদ্য ঐতিহ্য, নদীভিত্তিক খাবার, মৌসুমি রান্না, পিঠা-পায়েস বা ভর্তা—এইসব আসল খাবারের গল্প কেউ জানে না। তখনই তিনি সিদ্ধান্ত নেন—তিনি বিশ্বের সামনে বাংলাদেশি খাবারের প্রকৃত রূপ তুলে ধরবেন।
দীনা বেগম উপলব্ধি করেছিলেন, ব্রিটেনের মূলধারায় বাংলাদেশের খাবারের সত্যিকারের কণ্ঠস্বর কেউ তুলছেন না — আর সেই শূন্যতা পূরণ করাই হবে তার কাজ।
তার মিশন: বাংলাদেশের স্বাদ ও গল্প ছড়িয়ে দেওয়া
দীনা বেগমের লক্ষ্য শুধু রান্নার বই লেখা নয়; তিনি চেয়েছেন এক প্রজন্মের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে পুনর্জীবিত করতে।
তার মতে, বাংলাদেশের রান্না হলো “মায়ের হাতের স্পর্শ, পরিবারের উষ্ণতা, আর মাটির ঘ্রাণের মেলবন্ধন।”
তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের রান্নায় প্রতিটি পদ শুধু স্বাদের নয়, গল্পের বাহক। যেমন—
খিচুড়ি মানে বর্ষার বিকেল,
ইলিশ ভাজা মানে উৎসব,
ভর্তা মানে ঘরোয়া ভালোবাসা,
আর পিঠা মানে শীতের আনন্দ।
এই আবেগই তিনি তার লেখার প্রতিটি পাতায় তুলে ধরেছেন। তার কাছে রান্না কেবল পেশা নয়, এটি সাংস্কৃতিক গল্প বলার এক মাধ্যম।
দীনা বেগম মনে করেন, খাবার হচ্ছে সেই গল্প, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভালোবাসা ও স্মৃতি বহন করে।
দীনা বেগমের উক্তি: খাবার মানে গল্প
তিনি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেন,
“Bangladeshi food isn’t just curry — it’s identity, memory, and emotion.”
দীনা বেগম
(বাংলাদেশি খাবার শুধু ঝোল নয়—এটি পরিচয়, স্মৃতি ও অনুভূতি।)
এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি চান মানুষ বাংলাদেশি খাবারকে শুধু “রেস্তোরাঁর খাবার” হিসেবে না দেখে, বরং এক জাতির গল্প হিসেবে চিনুক।
দীনা বেগম এর এই চিন্তাধারা এখন ব্রিটিশ সমাজে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তার বইগুলো: বাংলাদেশের রান্নাকে নতুন ভাষায় উপস্থাপন
দীনা বেগম এখন পর্যন্ত একাধিক বই লিখেছেন, যার মধ্যে দুটি বিশেষভাবে আলোচিত —
“Brick Lane Cookbook” এবং “The Bangla Table”।
১. Brick Lane Cookbook: এক রাস্তায় বাংলাদেশের গল্প
এই বইটি প্রকাশের পর থেকেই পাঠক ও সমালোচক উভয়ের প্রশংসা পেয়েছে।
এখানে তিনি শুধু রেসিপি দেননি, বরং ব্রিক লেনের ইতিহাস, অভিবাসী জীবনের সংগ্রাম, আর খাবারের মাধ্যমে সম্পর্কের গল্প লিখেছেন।
তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে ব্রিটেনে থাকা বাংলাদেশিরা নিজের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে নতুন দেশে টিকে থেকেছে — খাবারের মাধ্যমেই।
বইটিতে আছে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পদ যেমন — চিংড়ি মালাইকারি, আলুভর্তা, দইচিংড়ি, খিচুড়ি, পিঠা, পায়েস ইত্যাদি। প্রতিটি রেসিপির সঙ্গে রয়েছে সেই খাবারের পেছনের গল্প — কখন খাওয়া হয়, কীভাবে তৈরি হয়, এবং কীভাবে পরিবারের সঙ্গে যুক্ত।
২. The Bangla Table: বাংলাদেশের স্বাদে ভরা এক ভ্রমণ
এই বইটি আরও গভীর, আরও নস্টালজিক।
এখানে তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের খাবারের বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন। যেমন—
সিলেটের মাছ ও শাকসবজিভিত্তিক রান্না,
খুলনার মিষ্টি ও চিংড়ি পদ,
বরিশালের ইলিশ ও পান্তাভাত সংস্কৃতি,
ঢাকা ও ময়মনসিংহের পিঠা-পায়েসের ঐতিহ্য।
বইটিতে তিনি প্রতিটি রেসিপির সঙ্গে ইতিহাস, আবেগ ও সংস্কৃতির দিকগুলোও ব্যাখ্যা করেছেন, যাতে পাঠক শুধু রান্না না শিখে, খাবারের পেছনের গল্পও জানে। দীনা বেগম এই বইয়ে বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের জীবনের সঙ্গে খাবারের সম্পর্ককে অনন্যভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
খাবার প্রচারে তার ভূমিকা
দীনা বেগম এখন ব্রিটেনের অন্যতম পরিচিত বাংলাদেশি ফুড লেখিকা।
তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয় BBC Food, The Guardian, Saveur, The Telegraph ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মাধ্যমে।
তিনি অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন ফুড ফেস্টিভ্যাল, টেলিভিশন শো ও কর্মশালায়, যেখানে তিনি বাংলাদেশের খাবার রান্না ও তার ঐতিহ্য ব্যাখ্যা করেন।
তার কাজের ফলে এখন ব্রিটেনে অনেক রেস্তোরাঁ বাংলাদেশের আসল খাবার পরিবেশন শুরু করেছে। আগে যেখানে “Bangladeshi Curry House” মানেই ছিল সাধারণ মশলাদার গ্রেভি, এখন সেখানে পরিবেশিত হচ্ছে আসল ইলিশ ভাজা, পান্তাভাত, খিচুড়ি, ডাল, ভর্তা, শুক্তো, দইচিংড়ি, এমনকি মিষ্টি দই পর্যন্ত।
দীনা বেগম বিশ্বাস করেন, খাবারের মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগ তৈরি করা যায়।
Read: ৫টি খাবার যা গোপনে কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে
বাংলাদেশি খাবারের নতুন পরিচয়
দীনা বেগম দেখিয়েছেন যে বাংলাদেশি খাবার কোনো “সাব-কালচার” নয়, এটি নিজেই এক শক্তিশালী খাদ্য-সংস্কৃতি।
তিনি বলেছেন,
“Our food deserves its own identity. It’s time the world knows Bangladeshi cuisine beyond curry.”
(আমাদের খাবারের নিজস্ব পরিচয় প্রাপ্য। এখন সময় এসেছে, বিশ্ব যেন কারির বাইরে বাংলাদেশের রান্নাকে চিনে।)
এই চিন্তাধারাই আজ ব্রিটিশ সমাজে নতুন পরিবর্তন আনছে। অনেক তরুণ বাংলাদেশি এখন গর্বের সঙ্গে তাদের ঐতিহ্য তুলে ধরছেন—ইনস্টাগ্রাম, ব্লগ, ইউটিউব বা ফুড ট্রাকে।
দীনা বেগম এই তরুণ প্রজন্মের কাছে আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতির এক গর্বিত প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
নারী হিসেবে তার অনুপ্রেরণাদায়ক ভূমিকা
দীনা বেগম শুধু সাংস্কৃতিক দূত নন, তিনি একজন অনুপ্রেরণামূলক নারীও। বাংলাদেশি মেয়েরা যেখানে প্রায়ই বিদেশে নিজেদের সংস্কৃতি নিয়ে সংকোচ বোধ করেন, সেখানে দীনা গর্বের সঙ্গে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেছেন।
তিনি প্রমাণ করেছেন, একজন নারী নিজের শিকড় ধরে রেখে বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা তৈরি করতে পারেন। তার বই ও কাজ অনেক তরুণীকে অনুপ্রাণিত করেছে নিজেদের গল্প ও ঐতিহ্য নিয়ে গর্ব করতে। অনেক পাঠক বলেন, দীনা বেগম তাদের দেখিয়েছেন কীভাবে রান্না হতে পারে আত্ম-প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম।
বাঙালি খাবারের বিশ্বযাত্রা
দীনা বেগমের প্রচেষ্টায় আজ বাংলাদেশের খাবার শুধু ব্রিটেনেই নয়, ইউরোপ ও আমেরিকাতেও জনপ্রিয় হচ্ছে। তার বই বিদেশি পাঠকদের শেখাচ্ছে কীভাবে সরল উপকরণ দিয়ে তৈরি বাঙালি খাবার হতে পারে একইসঙ্গে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।
তিনি প্রতিটি রেসিপির মাধ্যমে এক ধরনের সেতুবন্ধন তৈরি করেছেন — যেখানে বাংলাদেশি প্রবাসী ও বিদেশি পাঠক একই টেবিলে বসে একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নিতে পারে। দীনা বেগম প্রমাণ করেছেন, খাবার শুধুই স্বাদের নয়, এটি সংযোগ, পরিচয় ও ভালোবাসার ভাষা।
তার কাজের গভীর তাৎপর্য
দীনা বেগমের কাজ কেবল রান্নার নয়, এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ। তিনি শিখিয়েছেন, খাবার মানে শুধু স্বাদ নয় — এটি স্মৃতি, ইতিহাস ও পরিচয়ের ধারক। তার বই পড়লে বোঝা যায়, তিনি খাবারের মধ্যে খুঁজে পান মানুষের গল্প।
যেমন, এক বাটি ভর্তায় তিনি দেখেন গ্রামীণ জীবনের সরলতা; এক প্লেট খিচুড়িতে খুঁজে পান বৃষ্টির বিকেল আর পরিবারের একসঙ্গে বসার উষ্ণতা। দীনা বেগম তাই আজ শুধু একজন লেখিকা নন, বরং একজন গল্পকার, যিনি রান্নার মাধ্যমে বাংলাদেশের আত্মা তুলে ধরেছেন।
শেষ কথা
দীনা বেগম আজ এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন, নিজের সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া মানে নিজের শিকড়কে আরও শক্ত করে ধরা।
তার হাতের রান্না শুধু স্বাদ নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, মাটি, নদী, মানুষের ভালোবাসার প্রতিফলন। যেভাবে তিনি ব্রিটেনের সমাজে বাংলাদেশের খাবারকে নতুন মর্যাদা দিয়েছেন, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে।
দীনা বেগম দেখিয়েছেন—খাবার কখনও শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, এটি আমাদের গল্প বলার এক চিরন্তন উপায়।
Read: 5 Best Powerful Tips – ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে এমন “খারাপ” খাবার
সাধারণ প্রশ্নাবলী (FAQ)
প্রশ্ন ১: দীনা বেগম কে?
দীনা বেগম একজন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ফুড লেখিকা ও রাঁধুনি, যিনি ব্রিটেনে বাংলাদেশের আসল রান্নাকে পরিচিত করেছেন।
প্রশ্ন ২: দীনা বেগমের সবচেয়ে জনপ্রিয় বই কোনগুলো?
তার দুটি জনপ্রিয় বই হলো Brick Lane Cookbook এবং The Bangla Table, যেখানে তিনি বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও তার পেছনের গল্প তুলে ধরেছেন।
প্রশ্ন ৩: দীনা বেগম কেন বাংলাদেশি খাবারকে আলাদা পরিচয়ে তুলে ধরেছেন?
তিনি বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশের খাবার কেবল কারির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, স্মৃতি ও আবেগের প্রতিচ্ছবি।
প্রশ্ন ৪: দীনা বেগম কীভাবে অনুপ্রেরণা জোগান?
তার কাজ প্রমাণ করে, নিজের শিকড় ও সংস্কৃতিকে ধারণ করেও বিশ্বে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব — যা অনেক তরুণ ও তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা।