বার বার জ্বর আসার কারণ অনেক সময় সাধারণ ঠান্ডা–কাশির মতো শারীরিক সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বড় কোনো সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দুর্বলতা, বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই বার বার জ্বর আসার কারণ সঠিকভাবে বোঝা জরুরি, যাতে সময়মতো চিকিৎসা নেওয়া যায় এবং জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়।
এই নিবন্ধে আমরা বার বার জ্বর আসার কারণ নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করব, পাশাপাশি লক্ষণ, প্রতিরোধ, ঝুঁকি, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সব দিক তুলে ধরা হবে।
READ: অতিরিক্ত কাশি হলে কি করতে হবে: 7 Helpful Expert-Backed Remedies for Quick Recovery
বার বার জ্বর আসার কারণ: কেন এই সমস্যা ঘন ঘন দেখা দেয়?
বার বার জ্বর আসার কারণ বোঝার আগে জানতে হবে—জ্বর আসলে একটি রোগ নয়, বরং শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। শরীরে কোনো সংক্রমণ, ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা প্রদাহ দেখা দিলে শরীর তাপমাত্রা বাড়িয়ে ক্ষতিকর জীবাণুকে দুর্বল করার চেষ্টা করে।
১. ভাইরাসজনিত সংক্রমণ
বার বার জ্বর আসার কারণ হিসেবে ভাইরাস সংক্রমণই সবচেয়ে সাধারণ।
সাধারণ সর্দি–কাশি
যারা ধুলাবালু, আবহাওয়ার পরিবর্তন বা ভাইরাসের সংস্পর্শে বেশি থাকেন, তাদের প্রায়ই জ্বর আসতে পারে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস
বার বার ফ্লু হলে শরীরে দুর্বলতা তৈরি হয়, ফলে ফলস্বরূপ ঘন ঘন জ্বর দেখা দেয়।
২. ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ
টনসিলাইটিস
ঘন ঘন টনসিলে সংক্রমণ হলে বার বার জ্বর আসার কারণ হতে পারে।
ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)
বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এটি বার বার জ্বরের অন্যতম কারণ।
নিউমোনিয়া
ফুসফুসের সংক্রমণ সঠিকভাবে না সারলে পুনরায় জ্বর দেখা দিতে থাকে।
৩. ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া বা টাইফয়েডের অবশিষ্ট প্রভাব
ডেঙ্গু বা টাইফয়েডের পর শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ হতে সময় লাগে। এই সময়ে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে। ফলে বার বার জ্বর আসার কারণ হিসাবে পোস্ট–ইনফেকশন দুর্বলতাকে ধরা হয়।
৪. রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়া
যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল, তারা সবচেয়ে দ্রুত জ্বরে আক্রান্ত হন।
কারণ:
- পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব
- মানসিক চাপ
- অপুষ্টি
- দীর্ঘদিনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
৫. অ্যালার্জি বা প্রদাহ
শরীরের ভেতরে লুকানো প্রদাহ বার বার জ্বরের কারণ হতে পারে।
উদাহরণ:
- সাইনাস ইনফেকশন
- আর্থ্রাইটিস
- অটোইমিউন ডিজিজ
৬. দীর্ঘস্থায়ী রোগ
ডায়াবেটিস
দুর্বল ইমিউনিটির কারণে রোগীর মধ্যে ঘন ঘন সংক্রমণ দেখা দেয়।
থাইরয়েড সমস্যা
মেটাবলিজমে সমস্যা হলে শরীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখতে পারে না।
৭. পরিবেশগত কারণ
পরিবেশ দূষণ, গরম–ঠান্ডার আকস্মিক পরিবর্তন, দেহে পানিশূন্যতা—সবই বার বার জ্বর আসার কারণ হতে পারে।
বার বার জ্বর আসার কারণ: লক্ষণগুলো কেমন হতে পারে?
বার বার জ্বর হওয়ার পাশাপাশি শরীরে আরও কিছু উপসর্গ দেখা দেয়।
সাধারণ লক্ষণ
- ঘন ঘন অবসাদ
- মাথাব্যথা
- ঠান্ডা লাগা
- শরীর ব্যথা
- ক্ষুধামন্দা
গুরুতর লক্ষণের ইঙ্গিত
- শ্বাসকষ্ট
- বুকে ব্যথা
- গলা ফুলে যাওয়া
- দীর্ঘদিন জ্বর না কমা
- অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি
এসব ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বার বার জ্বর আসার কারণ নির্ণয়ে কোন কোন পরীক্ষা প্রয়োজন?
জ্বরের মূল কারণ নির্ণয় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রক্ত পরীক্ষা
- CBC
- ESR
- CRP
সংক্রমণ নির্ণয় পরীক্ষা
- ডেঙ্গু, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া
- ইউরিন টেস্ট
- থাইরয়েড টেস্ট
ইমেজিং
- এক্স–রে
- আল্ট্রাসনোগ্রাফি
বার বার জ্বর আসার কারণ সমাধানে করণীয়
পর্যাপ্ত বিশ্রাম
শরীরকে ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে বিশ্রাম দরকার।
পর্যাপ্ত পানি পান
ডিহাইড্রেশন থাকলে জ্বর লেগেই থাকতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার
ভিটামিন–সি, দই, ফলমূল—ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করে।
পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
হাত ধোয়া, পরিষ্কার পরিবেশ—সংক্রমণ কমায়।
প্রয়োজনে ওষুধ
প্যারাসিটামল বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নেওয়া যেতে পারে।
বার বার জ্বর আসার কারণ: কখন অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
- জ্বর ৩ দিন ধরে না কমলে
- বার বার ফিরে এলে
- অস্বাভাবিক দুর্বলতা
- শ্বাসকষ্ট
- বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ২৪ ঘণ্টার বেশি জ্বর
প্রতিরোধের উপায়
স্বাস্থ্যকর অভ্যাস
- পর্যাপ্ত ঘুম
- ব্যায়াম
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
সঠিক খাদ্যাভ্যাস
- পুষ্টিকর খাবার
- অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ডায়েট
পরিবেশগত সতর্কতা
- মশার কামড় থেকে সুরক্ষা
- পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন
Frequently Asked Questions (FAQ)
প্রশ্ন: বার বার জ্বর আসার কারণ কি সবসময় গুরুতর কিছু?
সবসময় নয়। কখনও সাধারণ সংক্রমণই দায়ী থাকে। তবে দীর্ঘদিন চললে পরীক্ষা জরুরি।
প্রশ্ন: কোন সংক্রমণে বার বার জ্বর বেশি দেখা যায়?
ঠান্ডা–কাশি, সাইনাস, টনসিল এবং ইউটিআই–তে বেশি দেখা যায়।
প্রশ্ন: শিশুদের বার বার জ্বর আসার কারণ কী?
শিশুদের ইমিউন সিস্টেম পূর্ণ বিকশিত নয়, তাই তাদের সংক্রমণ বেশি হয়।
প্রশ্ন: কি ধরনের খাবার জ্বরের সময় ভালো?
হালকা ভাত, খিচুড়ি, ফল, স্যুপ, পানি—এগুলো শরীরকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন: কতদিন জ্বর থাকলে ডাক্তার দেখানো উচিৎ?
২–৩ দিনের বেশি থাকলে অবশ্যই ডাক্তার দেখাতে হবে।
উপসংহার
বার বার জ্বর আসার কারণ কখনও সহজ, আবার কখনও জটিল হতে পারে। তাই ঘন ঘন জ্বর হওয়া কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিৎ নয়। সঠিক পরীক্ষা, চিকিৎসা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের মাধ্যমে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান সম্ভব।