Credit: Anh Nguyen
আমরা সবাই জানি—মাখন, ভাজা খাবার আর আইসক্রিম খেলে কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আরও কিছু খাবার আছে যেগুলোকে অনেকে স্বাস্থ্যকর মনে করেন, অথচ সেগুলোও চুপিচুপি শরীরে কোলেস্টেরল বাড়ায়। যদি আপনার মনে প্রশ্ন থাকে “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ”, এই খাবারগুলো অবশ্যই জানতে হবে।
এই খাবারগুলোর মধ্যে থাকে এমন কিছু উপাদান যা “খারাপ কোলেস্টেরল” (LDL) বাড়াতে সাহায্য করে। আর LDL বেড়ে গেলে হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও অন্যান্য হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কোন ৫টি খাবার আপনার অজান্তেই কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে, আর কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
১. আনফিল্টার্ড কফি
অনেকে মনে করেন কফি স্বাস্থ্যকর—এতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, শক্তি বাড়ে। কিন্তু কফি বানানোর পদ্ধতিটাই বড় পার্থক্য তৈরি করে।
ফ্রেঞ্চ প্রেস, এসপ্রেসো, তুর্কিশ বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কফি—এগুলো ফিল্টার ছাড়া বানানো হয়। ফলে এর মধ্যে থাকা ক্যাফেস্টল আর কাহউল নামের দুটি উপাদান সরাসরি কোলেস্টেরল বাড়ায়।
এগুলো লিভারে কোলেস্টেরল তৈরির প্রক্রিয়া বাড়িয়ে দেয় এবং শরীর থেকে কোলেস্টেরল বের হতে বাধা দেয়।
👉 সমাধান: যদি প্রতিদিন কফি পান করেন, চেষ্টা করুন পেপার ফিল্টার ব্যবহার করতে। এতে ওই ক্ষতিকর উপাদান আটকে যায় এবং কফি তুলনামূলক নিরাপদ হয়। এই হলো সেই খাবারের উদাহরণ যা দেখায়, কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ।
২. ঘি
আমাদের দেশে অনেকেই রান্নায় ঘি ব্যবহার করেন এবং ভাবেন এটি মাখনের চেয়ে স্বাস্থ্যকর। আসলে ঘি তৈরি হয় মাখন থেকে পানি ও দুধের অংশ আলাদা করে, ফলে শুধু ফ্যাট থেকে যায়।
এই ফ্যাটের বড় অংশ হলো স্যাচুরেটেড ফ্যাট, যা রক্তে LDL কোলেস্টেরল বাড়ায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ঘি বেশি খেলে শুধু LDL নয়, বরং ApoB নামক প্রোটিনও বেড়ে যায়। আর ApoB সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত।
👉 সমাধান: অল্প পরিমাণে ঘি খাওয়া ক্ষতিকর নয়, কিন্তু প্রতিদিন রান্নার তেল হিসেবে ঘি ব্যবহার করলে কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে। তাই মাঝে মাঝে ব্যবহার করুন, নিয়মিত নয়। এটি মনে রাখুন যদি ভাবেন “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ।”
৩. নারিকেল তেল ও পাম অয়েল
নারিকেল তেল অনেক সময় স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে প্রচার করা হয়, কিন্তু আসলে এতে স্যাচুরেটেড ফ্যাট প্রচুর পরিমাণে থাকে।
স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি খেলে লিভারের কোলেস্টেরল “রিসেপ্টর” ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে রক্ত থেকে কোলেস্টেরল সাফ হয় না এবং LDL বেড়ে যায়।
শুধু রান্নার তেল নয়, বরং অনেক গ্র্যানোলা বার, কুকিজ, এনার্জি বার, চিপস-এও নারিকেল বা পাম অয়েল ব্যবহার করা হয়।
👉 সমাধান: খাবারের লেবেল পড়ুন। যতটা সম্ভব অলিভ অয়েল, সরিষার তেল, সয়াবিন বা সূর্যমুখী তেল ব্যবহার করুন। এগুলো হৃদযন্ত্রের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ। নারিকেল ও পাম অয়েল হলো সেই খাবার যার কারণে “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ” জানতে হবে।
৪. লাল মাংস
গরু, খাসি বা ভেড়ার মাংসে প্রচুর স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও কোলেস্টেরল থাকে।
নিয়মিত বেশি পরিমাণে লাল মাংস খেলে LDL বেড়ে যায়।
প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস যেমন—সসেজ, বেকন, হট ডগ—এসব আরও ক্ষতিকর কারণ এতে প্রিজারভেটিভ, অতিরিক্ত লবণ ও ট্রান্স ফ্যাট থাকে।
👉 সমাধান:
লাল মাংস পুরোপুরি বাদ না দিয়ে সপ্তাহে ১–২ বার সীমিত পরিমাণে খাওয়া ভালো।
এর পরিবর্তে মুরগির মাংস, মাছ বা ডাল-শিমজাতীয় খাবার খান। এগুলো প্রোটিন সরবরাহ করবে কিন্তু কোলেস্টেরল বাড়াবে না। এটি স্পষ্ট উদাহরণ, কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ।
৫. প্রক্রিয়াজাত খাবার
চিপস, কুকিজ, কেক, প্যাকেট স্ন্যাকস—এসব খাবারে থাকে ট্রান্স ফ্যাট, স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং প্রচুর চিনি।
ট্রান্স ফ্যাট LDL বাড়ায় এবং “ভালো কোলেস্টেরল” (HDL) কমায়।
ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়।
👉 সমাধান: যতটা সম্ভব প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। যদি একেবারেই খেতে হয়, তবে “ট্রান্স ফ্যাট ফ্রি” লেখা আছে কি না সেটা দেখে নিন। আর নিয়মিত স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস যেমন—বাদাম, ফল, দই বেছে নিন। প্রক্রিয়াজাত খাবার হলো একটি উদাহরণ, যেগুলো “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ” তালিকায় থাকে।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: ডিম খেলে কি কোলেস্টেরল বাড়ে?
👉 আগের মতো এখন আর ডিমকে খুব ক্ষতিকর বলা হয় না। ডিমে কোলেস্টেরল আছে ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের রক্তে কোলেস্টেরল তেমন বাড়ায় না। আসল সমস্যা হয় যদি ডিম বেশি তেলে ভেজে বা মাখন-চিজের সঙ্গে খাওয়া হয়। এটি দেখতে পারেন “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ” নির্দেশিকায়।
প্রশ্ন ২: চিংড়ি বা মাছের ডিম খেলে কি ক্ষতি হয়?
👉 এসব খাবারে কোলেস্টেরল থাকলেও, স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম। তাই পরিমাণমতো খেলে সমস্যা হয় না। বরং সামুদ্রিক মাছের ওমেগা-৩ ফ্যাট হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী।
প্রশ্ন ৩: ঘি কি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে?
👉 না। অল্প পরিমাণ ঘি খাওয়া ক্ষতিকর নয়। তবে প্রতিদিন রান্নার তেল হিসেবে ঘি ব্যবহার করলে কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে। তাই অলিভ অয়েল, সরিষার তেল বা অন্যান্য ভেজিটেবল অয়েল ব্যবহার করাই ভালো। এটি “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ” বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন ৪: ফাস্টফুড কেন কোলেস্টেরল বাড়ায়?
👉 কারণ ফাস্টফুডে থাকে ট্রান্স ফ্যাট, বেশি নুন আর বেশি ক্যালরি। এগুলো শরীরের “খারাপ কোলেস্টেরল” বাড়ায় এবং ধমনিতে প্লাক জমার ঝুঁকি বাড়ায়।
প্রশ্ন ৫: কোলেস্টেরল কমাতে কোন খাবার ভালো?
👉 ওটস, বার্লি, ডাল, শাকসবজি, ফল, বাদাম, অলিভ অয়েল আর চিয়া বা ফ্ল্যাক্সসিডের মতো বীজ খাওয়া খুব উপকারী। এগুলো শরীর থেকে খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। এগুলোই খাওয়া উচিত যখন চিন্তা করা হয় “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ।”
আমাদের বিশেষজ্ঞের মতামত
প্রতিদিন ডিম, দুধ বা মাংস খাওয়া নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে। আসলে সবার শরীর একরকম নয়।
- কারও শরীরে ডিম খেলে কোলেস্টেরল খুব একটা বাড়ে না, আবার কারও ক্ষেত্রে দ্রুত বাড়ে।
- তবে ভালো দিক হলো, ডিমে প্রচুর ভিটামিন, মিনারেল ও উচ্চমানের প্রোটিন আছে। এগুলো শরীরকে সুস্থ রাখে, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
- ডিমে স্যাচুরেটেড ফ্যাট খুব কম, তাই মাপ মতো খেলে এটি কোলেস্টেরল তেমন বাড়ায় না।
👉 আসল বিষয় হলো সমতা। অতিরিক্ত কোনো খাবার নয়, বরং সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম আর স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের সেরা উপায়। এটি বোঝায় “কোলেস্টেরল হলে কি কি খাওয়া নিষেধ।”