Credit: The Design Lady
পিনাট বাটার এমন এক খাবার যা অনেকের নাস্তার প্লেটে বা রান্নাঘরের তাকের শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে। তবে যেহেতু এতে চর্বির পরিমাণ তুলনামূলকভাবে বেশি, তাই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—“পিনাট বাটার খেলে কোলেস্টেরল কি বেড়ে যায়, নাকি কমে?”
আসলে পিনাট বাটারের চর্বি সবসময় খারাপ নয়। বরং প্রাকৃতিক পিনাট বাটার খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য ভালো হতে পারে। অনেকেই জানেন না, পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা কেবল কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শরীরকে শক্তি জোগানো ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়ার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে।
পিনাট বাটারে থাকা উদ্ভিজ্জ স্টেরল (Plant Sterols) এবং আঁশ (Fiber) শরীরে কোলেস্টেরল শোষণ কমিয়ে দেয়। তবে সর্বোচ্চ উপকার পেতে হলে এমন পিনাট বাটার বেছে নেওয়া উচিত যাতে শুধু পিনাট থাকে—অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা হাইড্রোজেনেটেড তেল থাকলে তা হৃদ্স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
নরম ক্রিমি, কড়মড়ে ক্রাঞ্চি কিংবা চকোলেট মেশানো—সব ধরনের পিনাট বাটারই স্বাদে অসাধারণ। শুধু রুটি-মাখনের বদলে নয়, এটি সালাদ, স্মুদি, এমনকি সস হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এত জনপ্রিয় হওয়ার পরও প্রশ্ন থেকেই যায়:
👉 পিনাট বাটার কি সত্যিই কোলেস্টেরল কমাতে পারে?
👉 নাকি এটি অতিরিক্ত চর্বির কারণে হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়?
নিবন্ধিত পুষ্টিবিদদের মতে, সুখবর হলো—যদি সঠিক ধরনের পিনাট বাটার বেছে নেওয়া যায় এবং মাপমতো খাওয়া হয়, তবে এটি কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং হৃদ্স্বাস্থ্যের উন্নতিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবে পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা সুস্থ জীবনের জন্য কার্যকরভাবে প্রমাণিত হয়।
কেন পিনাট বাটার কোলেস্টেরলের জন্য উপকারী হতে পারে
পুষ্টিবিদ জ্যাকি নিউজেন্ট, আর.ডি.এন. বলেন,
“পিনাট বাটারে থাকা স্বাস্থ্যকর চর্বির অনুপাতের কারণে প্রাকৃতিক ও কম প্রক্রিয়াজাত পিনাট বাটার খাদ্যতালিকায় যোগ করলে ভালো কোলেস্টেরল (HDL) বাড়াতে এবং খারাপ কোলেস্টেরল (LDL) কমাতে সাহায্য করতে পারে—বিশেষত যখন এটি উচ্চ স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবারের পরিবর্তে খাওয়া হয়।”
১. স্বাস্থ্যকর চর্বির চমৎকার উৎস
পিনাট বাটার হলো মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং পলিআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট—এই দুই ধরনের স্বাস্থ্যকর চর্বির ভালো উৎস। পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা এখানেই স্পষ্ট হয়, কারণ এগুলো LDL কমাতে সাহায্য করে।
পুষ্টিবিদ মেলিসা হুপার, এম.এস., আর.ডি.এন. বলেন,
“এই দুই ধরনের আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটই LDL কোলেস্টেরল কমাতে কার্যকর।”
গবেষণায় দেখা গেছে যে মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাট সামান্য পরিমাণে HDL বা ভালো কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। HDL বাড়লে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে, কারণ HDL রক্তনালিতে জমে থাকা অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সরাতে সহায়তা করে।
এভাবে HDL এবং LDL-এর অনুপাত যখন হৃদ্বান্ধব দিকে পরিবর্তিত হয়, তখন হৃদ্স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে। পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্যন্ত্রকে সুরক্ষা দিতেও কার্যকর।
এ ছাড়া পিনাট বাটার হলো উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের ভালো উৎস। এটি প্রাণিজ প্রোটিনের তুলনায় কম স্যাচুরেটেড ফ্যাটসমৃদ্ধ হওয়ায় হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
২. আঁশের উপস্থিতি
প্রতি ২ টেবিলচামচ পিনাট বাটারে প্রায় ২ গ্রাম ফাইবার থাকে, যার মধ্যে সামান্য দ্রবণীয় আঁশ (Soluble Fiber) আছে। এই দ্রবণীয় আঁশ খাবার হজমের সময় কোলেস্টেরলের শোষণ কিছুটা কমিয়ে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে LDL নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
যদিও এটি খুব বেশি আঁশের উৎস নয়, তবুও প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় এমন ছোট ছোট উৎসও গুরুত্ব রাখে। পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা এখানে ফাইবারের জন্যও প্রমাণিত।
৩. উদ্ভিজ্জ স্টেরলের কার্যকারিতা
পিনাট বাটারে থাকা উদ্ভিজ্জ স্টেরলও কোলেস্টেরল কমাতে ভূমিকা রাখে।
পুষ্টিবিদ মেগান হাফ, আর.ডি.এন. বলেন,
“উদ্ভিজ্জ স্টেরল হলো প্রাকৃতিক যৌগ যা অন্ত্রে কোলেস্টেরল শোষণকে বাধা দেয়, ফলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমতে সাহায্য করে।”
পিনাট বাটার খাওয়ার ক্ষেত্রে সচেতনতা
যদিও পিনাট বাটার হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, তবুও কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি—কারণ সব ধরনের পিনাট বাটার একরকম নয়। পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা পেতে হলে সঠিক নির্বাচন এবং সঠিক পরিমাণ মেনে চলা জরুরি।
১. পরিমাণে নিয়ন্ত্রণ
পিনাট বাটার হলো ক্যালরি-ঘন খাবার।
পুষ্টিবিদ হাফ বলেন,
“যদিও পিনাট বাটারে স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট আছে, তবুও চর্বি ক্যালরিতে সমৃদ্ধ। তাই বেশি খেলে অল্প পরিমাণ খাবার থেকেই অনেক ক্যালরি শরীরে জমা হয়ে যায়।”
একটি মানক পরিবেশন হলো ২ টেবিলচামচ। প্রতিদিন এর বেশি খেলে অতিরিক্ত ক্যালরি জমতে পারে, যা ওজন বাড়াতে পারে এবং হৃদ্স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। সঠিক পরিমাণ মানলে পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা প্রকৃতভাবে পাওয়া যায়।
২. উপাদান যাচাই করুন
পুষ্টিবিদ হাফের পরামর্শ,
“যতটা সম্ভব এমন পিনাট বাটার কিনুন যেটিতে শুধু পিনাট আছে—কোনো বাড়তি চিনি, অতিরিক্ত লবণ বা হাইড্রোজেনেটেড তেল ছাড়া।”
- হাইড্রোজেনেটেড তেল LDL কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
- অতিরিক্ত চিনি রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা বাড়ায়, যা হৃদ্রোগের আরেকটি ঝুঁকির কারণ।
- অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
হৃদ্বান্ধব খাদ্যতালিকায় পিনাট বাটার যোগ করার ৭টি সহজ উপায়
১. স্মুদি: কলার সঙ্গে এক চামচ পিনাট বাটার ব্লেন্ড করুন। এটি প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও স্বাদ যোগ করবে এবং রক্তে শর্করার হঠাৎ বৃদ্ধিও ঠেকাবে।
২. নুডলসের সস: জ্যাকি নিউজেন্টের পরামর্শ অনুযায়ী, পিনাট বাটার, লেবুর রস ও কুঁচি করা আদা ফেটিয়ে নুডলসের জন্য স্বাস্থ্যকর সস বানিয়ে নিন।
৩. ওটমিল বা দইয়ের সঙ্গে: সকালের ওটমিল, রাতভর ভেজানো ওটস বা দইয়ে এক চামচ পিনাট বাটার মিশিয়ে নিন। এটি সকালের খাবারে ফাইবার ও প্রোটিন যোগ করবে।
৪. টোস্টে মাখুন: গোটা শস্যের রুটিতে পিনাট বাটার মেখে ঝটপট সকালের নাশতা তৈরি করুন। এটি শক্তি জোগায় এবং পেটও ভরা রাখে।
৫. পপকর্নের ওপর ছড়িয়ে দিন: হালকা গরম করা পিনাট বাটার পপকর্নের ওপর ছড়িয়ে নিন। এটি মাখনের তুলনায় স্বাস্থ্যকর ও স্বাদে ভিন্ন।
৬. ডেজার্ট স্প্রেড: পিনাট বাটারের সঙ্গে আনস্যুইটেনড কোকো পাউডার ও পাকা কলা মিশিয়ে নিন। এই স্প্রেড স্বাস্থ্যকর, মিষ্টি ও বাড়তি চিনি ছাড়া।
৭. সালাদের ড্রেসিং: সামান্য পিনাট বাটার, লেবুর রস ও লো-সোডিয়াম সয়াসস মিশিয়ে সালাদের জন্য ড্রেসিং তৈরি করতে পারেন।
এসব উপায়ে পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সহজেই যুক্ত করা যায়।
অতিরিক্ত টিপস
- ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে প্রাকৃতিক পিনাট বাটার দীর্ঘদিন ভালো থাকে এবং তেলের স্তর আলাদা হয়ে যাওয়া কমে।
- কম বয়সী শিশুদের জন্য পিনাট বাটার দেওয়ার আগে অ্যালার্জি আছে কি না, তা নিশ্চিত হয়ে নিন।
- যাদের ডায়াবেটিস আছে তারা চিনি ছাড়া পিনাট বাটার বেছে নিন এবং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
প্রাকৃতিক পিনাট বাটার হলো এমন এক খাবার যা কেবল স্বাদের জন্য নয়, স্বাস্থ্যগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে থাকা আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট, উদ্ভিজ্জ স্টেরল ও ফাইবার একসঙ্গে কাজ করে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং হৃদ্যন্ত্রের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে।
তবে সবসময় পরিমাণে সচেতন থাকতে হবে এবং কেনার সময় উপাদানের লেবেল দেখে নিতে হবে যেন বাড়তি চিনি, লবণ বা তেল না থাকে। যদি সঠিকভাবে খাওয়া হয়, পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা আপনার দৈনন্দিন হৃদ্বান্ধব খাদ্যতালিকার একটি সহজ, সুস্বাদু এবং পুষ্টিকর অংশ হতে পারে।
FAQ: পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা
প্রশ্ন ১: পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা কি শুধু কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ?
উত্তর: না। এটি শক্তি জোগায়, শরীরে প্রোটিন যোগ করে, এবং দীর্ঘসময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।
প্রশ্ন ২: ডায়াবেটিস রোগীরা কি পিনাট বাটার খেতে পারবেন?
উত্তর: পারবেন, তবে অবশ্যই চিনি ছাড়া প্রাকৃতিক পিনাট বাটার বেছে নিতে হবে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ মেনে চলতে হবে।
প্রশ্ন ৩: প্রতিদিন কতটুকু পিনাট বাটার খাওয়া নিরাপদ?
উত্তর: সাধারণত প্রতিদিন ২ টেবিলচামচ পর্যন্ত খাওয়া নিরাপদ এবং এতে পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা সবচেয়ে ভালোভাবে পাওয়া যায়।
প্রশ্ন ৪: শিশুরা কি পিনাট বাটার খেতে পারে?
উত্তর: পারে, তবে অ্যালার্জি আছে কি না, তা আগে নিশ্চিত হতে হবে।
প্রশ্ন ৫: পিনাট বাটার খাওয়ার উপকারিতা কি ওজন কমাতে সাহায্য করে?
উত্তর: হ্যাঁ, সঠিক পরিমাণে খেলে এটি ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে।