Credit: Becca Paul
ভূমিকা
প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়? ডিম কতটা খাওয়া ঠিক হবে তা নিয়ে বিভ্রান্ত? আপনি একা নন! বছরের পর বছর ধরে, ডিম কোলেস্টেরলে কীভাবে প্রভাব ফেলে তা নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। ডিমে কোলেস্টেরল বেশি থাকলেও, সবার রক্তের কোলেস্টেরলে এর প্রভাব সমান নয়। এটি মূলত যকৃতের কার্যকারিতা এবং জিনগত পার্থক্যের কারণে হতে পারে।
যদি “সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর খাদ্য” নামে কোনো পুরস্কার থাকত, তবে তা ডিমের প্রাপ্য হতো। কখনও শোনা যায় ডিম হার্ট-সুস্থ রাখে, আবার কখনও শোনা যায় এটি হার্টের জন্য ক্ষতিকর।
প্রথমেই সুসংবাদ: বেশিরভাগ মানুষের জন্য ডিম একটি স্বাস্থ্যকর, সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে। “ডিম উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন A, D, E, K এবং B-ভিটামিনের একটি সাশ্রয়ী উৎস, এছাড়াও এতে রয়েছে লুটিন ও কোলিন,” বলেন সুসান হোয়াইট, RDN, যিনি হৃদ্স্বাস্থ্যে বিশেষজ্ঞ একজন নিবন্ধিত ডায়েটিশিয়ান।
তবে একই সময়ে, ডিমে খাদ্যজনিত কোলেস্টেরলও থাকে। আর এখানেই জটিলতা। আসলে, আমরা সবাই কোলেস্টেরল সমানভাবে শোষণ বা বিপাক করি না। তাই যদি ভাবেন প্রতিদিন এক বা দুটি ডিম খেলে আপনার কোলেস্টেরলে কী হবে, তার উত্তর সবার ক্ষেত্রে আলাদা।
যদি জানতে চান প্রতিদিন আপনার জন্য কতটা ডিম নিরাপদ, পড়তে থাকুন।
প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়—এই প্রশ্নে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। কেউ বলেন, ডিম হলো “সুপারফুড” যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, আবার কেউ বলেন ডিম কোলেস্টেরল বাড়িয়ে হার্টের ক্ষতি করে। এই দ্বন্দ্ব বছরের পর বছর ধরে চলছে। আসলে ডিমে কোলেস্টেরল থাকলেও এর প্রভাব সবার শরীরে এক রকম হয় না। জিন, যকৃতের কার্যকারিতা এবং খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতার কারণে প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়, তার উত্তর একেকজনের জন্য একেক রকম হতে পারে।
তাহলে আসল সত্যটা কী? ডিম কি বন্ধু, নাকি শত্রু? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
কোলেস্টেরল শরীরে কী করে?
কোলেস্টেরল আমাদের শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি হরমোন তৈরিতে, ভিটামিন D উৎপাদনে এবং কোষের ঝিল্লি মজবুত রাখতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল রক্তনালীর দেয়ালে জমতে শুরু করে।
এই জমে থাকা কোলেস্টেরল ধীরে ধীরে ধমনীকে সরু করে দেয়, যাকে এথেরোস্ক্লেরোসিস বলা হয়। এর ফলে রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। গুরুতর অবস্থায় হার্টে ব্লক তৈরি হলে ডাক্তাররা স্টেন্ট বা রিং বসান। কিন্তু এই চিকিৎসা ব্যয়বহুল এবং অনেকের নাগালের বাইরে। তাই প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়, তা বোঝার আগে কোলেস্টেরলের ভূমিকা বোঝা জরুরি।
প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়: কোলেস্টেরলের ৩টি প্রধান প্রভাব
১. কোলেস্টেরল শোষণ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন
একটি বড় ডিমে প্রায় ২০৬ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে। তবে আমাদের শরীর প্রতিদিন নিজে থেকেই ৮০০–১,০০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল তৈরি করে। তাই শুধু খাবারের কোলেস্টেরলই রক্তে এর মাত্রা নির্ধারণ করে না। কারও শরীর খাবারের কোলেস্টেরল ২০% পর্যন্ত শোষণ করে, আবার কারও শরীর ৮০% পর্যন্ত শোষণ করতে পারে। ফলে প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়, তা মূলত নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের শোষক (absorber)।
২. ডিমে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কম
স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি খেলে ক্ষতিকর LDL কোলেস্টেরল বাড়ে। এজন্যই হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়? সুখবর হলো, ডিমে স্যাচুরেটেড ফ্যাট মাত্র ১.৬ গ্রাম, যা খুবই কম। ডিমের বাকি ফ্যাট আনস্যাচুরেটেড, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ভালো।
৩. ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে
স্থূলতা কোলেস্টেরল বাড়ায়, কারণ অতিরিক্ত চর্বি শরীরে কোলেস্টেরল উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন ১০% কমলে কোলেস্টেরলও কমে। প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে প্রোটিনের কারণে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে, অতিরিক্ত খাবার খাওয়া কমে যায় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
প্রতিদিন ২টা করে ডিম খাওয়ার ৭টি স্বাস্থ্য উপকারিতা
- উচ্চমানের প্রোটিন – শরীরের পেশি গঠন ও মেরামতে সাহায্য করে।
- চোখের জন্য ভালো – লুটিন ও জিয়াজ্যান্থিন দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করে।
- মস্তিষ্কের শক্তি বাড়ায় – কোলিন স্মৃতিশক্তি উন্নত করে।
- হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখে – ভিটামিন D ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে।
- ইমিউনিটি বাড়ায় – ভিটামিন A ও E রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
- ওজন কমাতে সহায়তা করে – দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
- সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী – কম খরচে পুষ্টিগুণ পাওয়া যায়।
প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়: সম্ভাব্য অপকারিতা
সব খাবারেরই যেমন উপকারিতা আছে, তেমনি অপকারিতাও থাকতে পারে। ডিমও তার ব্যতিক্রম নয়।
- কোলেস্টেরল বেড়ে যেতে পারে – যাদের শরীর বেশি কোলেস্টেরল শোষণ করে, প্রতিদিন ২টা করে ডিম খাওয়া LDL কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে।
- হৃদ্ঝুঁকি বাড়তে পারে – ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ডিম ধমনী ব্লক করতে পারে।
- ক্যালরি বেশি হলে ওজন বাড়তে পারে – ডিম নিজে কম ক্যালরির হলেও অন্য ক্যালরি-সমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে খেলে ওজন বাড়তে পারে।
- অ্যালার্জির ঝুঁকি – অনেকের শরীরে ডিম খেলে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।
- প্রসেসড ডিম খাবারের ক্ষতি – কেক, পেস্ট্রি, মেয়োনিজে থাকা ডিম স্বাস্থ্যকর নয় কারণ এগুলোতে অতিরিক্ত ফ্যাট ও চিনি থাকে।
কতগুলো ডিম খাওয়া নিরাপদ?
আগে বলা হতো দিনে সর্বোচ্চ ৩০০ মিলিগ্রাম খাদ্য কোলেস্টেরল খাওয়া নিরাপদ। এখন নির্দিষ্ট সীমা নেই, শুধু “কম খাওয়া”র পরামর্শ দেওয়া হয়। সুস্থ মানুষের জন্য প্রতিদিন ১–২টি ডিম সাধারণত নিরাপদ। কিন্তু প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়, তা বুঝতে হলে আপনার স্বাস্থ্যঝুঁকি জানা জরুরি।
- সুস্থ মানুষ → দিনে ১–২টি ডিম খাওয়া নিরাপদ।
- ডায়াবেটিস বা উচ্চ কোলেস্টেরল রোগী → সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৩টি কুসুম খাওয়া ভালো।
- ডিমের সাদা অংশ → এতে কোলেস্টেরল নেই, তাই যত খুশি খাওয়া যায়।
ডিম খাওয়ার স্বাস্থ্যকর উপায়
- উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাবারের সঙ্গে খান – ফল, সবজি, ডাল ও বাদামের সঙ্গে ডিম মিলিয়ে খেলে সুষম হয়।
- ওমলেটে সবজি যোগ করুন – পুষ্টিগুণ বাড়ে।
- সাদা অংশ বেশি ব্যবহার করুন – ১টি কুসুমের সঙ্গে ২–৩টি সাদা অংশ মেশান।
- সেদ্ধ বা পোচ ডিম বেছে নিন – মাখন বা বেকনে ভাজার চেয়ে অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন।
প্রশ্নোত্তর (FAQ)
প্রশ্ন ১: প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে কি হয়?
উত্তর: সুস্থ মানুষের জন্য এটি সাধারণত নিরাপদ, ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং প্রোটিন সরবরাহ করে।
প্রশ্ন ২: ডিম কি সত্যিই কোলেস্টেরল বাড়ায়?
উত্তর: সবার শরীরে সমানভাবে প্রভাব ফেলে না। কারও ক্ষেত্রে কোলেস্টেরল বাড়ে, কারও ক্ষেত্রে তেমন পরিবর্তন হয় না।
প্রশ্ন ৩: ডায়াবেটিস রোগীর জন্য প্রতিদিন ২টা করে ডিম খাওয়া কি নিরাপদ?
উত্তর: সাদা অংশ নিরাপদ, তবে কুসুম সপ্তাহে ৩টির বেশি খাওয়া উচিত নয়।
প্রশ্ন ৪: প্রতিদিন ২টা করে ডিম খেলে ওজন কমবে নাকি বাড়বে?
উত্তর: নিয়ন্ত্রিত ডায়েটে খেলে ডিম ওজন কমাতে সহায়ক, কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালরির সঙ্গে খেলে ওজন বাড়তে পারে।
প্রশ্ন ৫: ডিম কি হৃদ্রোগীদের জন্য ক্ষতিকর?
উত্তর: ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের ক্ষেত্রে সীমিত পরিমাণে খাওয়া উচিত এবং অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আমাদের বিশেষজ্ঞের মতামত
যদি আপনি ভাবছেন প্রতিদিন ডিম খেলে আপনার কোলেস্টেরলের কী হয়, তবে উত্তরটি সবার জন্য আলাদা। ভালো দিক হলো, ডিম ভিটামিন এবং মিনারেলে সমৃদ্ধ এবং এতে উচ্চমানের প্রোটিন থাকে, যা স্বাস্থ্যকর শরীরের ওজন বজায় রাখতে সাহায্য করে কোলেস্টেরল কমাতেও সহায়ক হতে পারে। এছাড়াও ডিমে স্যাচুরেটেড ফ্যাট খুবই কম, যা কোলেস্টেরল বাড়ানোর প্রধান কারণ। যদিও ডিমে কোলেস্টেরল রয়েছে, খাদ্যজনিত কোলেস্টেরলের প্রভাব রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রায় তুলনামূলকভাবে কম, শরীর প্রাকৃতিকভাবে যে কোলেস্টেরল উৎপাদন করে তার তুলনায়। তাই, প্রতিদিন একটি করে সম্পূর্ণ ডিম খাওয়া অধিকাংশ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সাধারণত নিরাপদ।
তবে, কিছু মানুষ জেনেটিকভাবে অন্যদের তুলনায় খাবার থেকে বেশি কোলেস্টেরল শোষণ করতে সক্ষম। যদি আপনি লক্ষ্য করেন যে বেশি ডিম খাওয়া শুরু করার পর আপনার কোলেস্টেরল বেড়ে যাচ্ছে, তবে কমানো উচিত। একইভাবে, যদি আপনার হৃদ্রোগের ঝুঁকির কারণ থাকে, যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা উচ্চ কোলেস্টেরল, তবে আপনার ডাক্তার হয়তো প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ তিনটি সম্পূর্ণ ডিম খেতে বলবেন। সবশেষে, সবার পুষ্টিগত প্রয়োজন আলাদা। “ইতিহাসগতভাবে, আমরা যখন পুষ্টি নিয়ে ভাবি, প্রায়শই আমরা নির্দিষ্ট খাবারকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ হিসেবে বিবেচনা করি,” বলেন হোয়াইট। কিন্তু ডিম এবং কোলেস্টেরলের ক্ষেত্রে, এক নিয়ম সবার জন্য প্রযোজ্য নয়।
Featured Image Credit: Becca Paul