Credit: Brooke Lark
ওজন কমানোর সহজ উপায় খুঁজছেন? জানুন ৫টি কার্যকর খাবার যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে, পেট ভরা রাখে এবং স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমাতে সাহায্য করে।
আপনি জেনে অবাক এবং খুশি হতে পারেন যে আপনার কিছু প্রিয় খাবার ডায়েট থেকে বাদ দিতে হবে না। অনেক সময় আমরা ভাবি কিছু নির্দিষ্ট খাবার খেলে ওজন কমানো অসম্ভব হয়ে যায়, কিন্তু সত্যিটা মোটেও তা নয়।
একটি মাত্র খাবার আপনার ওজন কমানোর লক্ষ্যকে সফল বা ব্যর্থ করতে পারে না—বরং বিষয়টি নির্ভর করে আপনার পুরো খাদ্যাভ্যাস এবং বৈচিত্র্যের ওপর। উদাহরণস্বরূপ, দুধজাত খাবার, সম্পূর্ণ শস্য, আলু, ডিম এবং পপকর্ন—সবই সঠিকভাবে খেলে এবং স্বাস্থ্যকরভাবে রান্না করলে ওজন কমানোর ডায়েটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
যেসব খাবারের খারাপ খ্যাতি রয়েছে, সেগুলো আসলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল ধারণার শিকার। মানুষ প্রায়ই এই খাবারগুলো সম্পর্কে বলে থাকে যে এগুলো “খারাপ”, “মোটা করে ফেলে” বা “ওজন বাড়ায়”। কিন্তু সত্যিকার অর্থে, কোনো একক খাবারই আপনাকে মোটা বা রোগা করতে পারে না।
ওজন বাড়া বা কমা এক দিনের নয়—এটি দীর্ঘ সময় ধরে আপনার মোট ডায়েট এবং জীবনধারার ফলাফল। তাই যদি আপনার ডায়েটে কোনো একটি খাবার থাকে, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার ওজন বাড়াবে বা কমাবে—এমন ধারণা ভুল।
আসলে, আজ আমরা যেসব “খারাপ” খাবারের কথা বলবো, সেগুলো ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে। এই খাবারগুলো প্রোটিন ও ফাইবারে সমৃদ্ধ—যা ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করতে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে।
বিশ্বাস করুন বা না করুন, অনেক খাবার যেগুলোকে আপনি হয়তো ডায়েট থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, সেগুলোও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে। চলুন জেনে নিই ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে সহায়ক এমন ৫টি তথাকথিত “খারাপ” খাবারের কথা।
১. ফুল-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার (Full-Fat Dairy)
আমরা প্রায়ই শুনি যে কম চর্বিযুক্ত বা লো-ফ্যাট দুধজাত খাবার খেতে হবে। অনেকেই ওজন কমানোর জন্য স্কিমড মিল্ক বা টোনড মিল্ক খান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফুল-ফ্যাট দুধ, ঘি, চিজ বা মাখন খাওয়া যাবে না?
হ্যাঁ, ফুল-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবারে কম ফ্যাটযুক্ত খাবারের তুলনায় ক্যালরি ও চর্বি বেশি থাকে। কিন্তু গবেষণা বলছে, ফুল-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া সরাসরি ওজন বাড়ায় না।
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, ফুল-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার খাওয়া শিশু বা বড়দের স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ায় না। এমনকি যারা পূর্ণচর্বিযুক্ত দুধ খান, তাদের দৈনিক ক্যালরি হয়তো কিছুটা বেশি হয়, কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই প্রতিদিন প্রয়োজনীয় তিন বেলার দুগ্ধজাত খাবার খান না।
আরেকটি সাধারণ ভয় হলো, ফুল-ফ্যাট দুধে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক:
৮ আউন্স (প্রায় এক গ্লাস) ফুল-ফ্যাট দুধে থাকে ৪.৫ গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট।
একই পরিমাণ ১% ফ্যাটযুক্ত দুধে থাকে মাত্র ১.৪ গ্রাম।
তবুও গবেষণায় দেখা গেছে, ফুল-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার হৃদ্রোগ বা মেটাবলিক ঝুঁকি বাড়ায় না। বরং ফারমেন্টেড দুগ্ধজাত খাবার যেমন ফুল-ফ্যাট দই ও চিজ হৃদ্রোগ এবং টাইপ–২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও সাহায্য করতে পারে।
উপসংহার: যদি আপনার ডায়েটে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ থাকে এবং রান্নার পদ্ধতি স্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে ফুল-ফ্যাট দুধজাত খাবার ডায়েটে রাখা যেতে পারে। এটি একটি কার্যকর ওজন কমানোর সহজ উপায়।
২. কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ শস্যদানা (Carb-Rich Grains)
কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকায় পাস্তা, রুটি, ভাত ইত্যাদি শস্যদানা প্রায়ই “খারাপ” খাবার হিসেবে চিহ্নিত হয়। অনেক ডায়েটে এই খাবারগুলো পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু সত্য হলো, কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ শস্যদানা সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমানোর জন্য লো-কার্ব ডায়েট এবং ব্যালান্সড-কার্ব ডায়েট অনুসরণকারীদের ওজন কমানোর ফলাফলে তেমন পার্থক্য নেই। আসলে মোট ক্যালরি গ্রহণই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কেবল কার্বোহাইড্রেট কমানো নয়।
তাছাড়া, সম্পূর্ণ শস্য যেমন ব্রাউন রাইস, কুইনোয়া, ওটস ইত্যাদিতে প্রচুর ফাইবার থাকে। ফাইবার ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে, হজমে সাহায্য করে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে। ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে এগুলো প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে উপকার পাওয়া যায়।
উপসংহার: রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট যেমন সাদা পাউরুটি বা অতিরিক্ত প্রসেসড পাস্তার পরিবর্তে সম্পূর্ণ শস্য বেছে নিন। এটি একটি কার্যকর ওজন কমানোর সহজ উপায় হতে পারে।
৩. ডিম (Eggs)
ডিমকে নিয়ে অনেক বিতর্ক হয় কারণ এতে কোলেস্টেরল থাকে। অনেকেই মনে করেন প্রতিদিন ডিম খেলে কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে বা হৃদ্রোগ হবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ডিম খাওয়া সরাসরি রক্তের কোলেস্টেরল বা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায় না।
একটি বড় ডিমে থাকে:
- প্রায় ৭০ ক্যালরি
- ৫ গ্রাম ফ্যাট
- ৬ গ্রাম প্রোটিন
ডিম হলো এক সুষম খাবার যা সহজেই ওজন কমানোর ডায়েটে রাখা যায়।
৩২টি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ডিম খাওয়া শরীরের ওজন বাড়ায় না। বরং ডিমের প্রোটিন ক্ষুধা কমাতে এবং দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এটি একটি বাস্তবসম্মত ওজন কমানোর সহজ উপায়।
এছাড়াও, কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ক্যালরি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ডিম খেয়েছেন, তাদের BMI (বডি মাস ইনডেক্স) কমেছে।
উপসংহার: প্রতিদিনের ডায়েটে ১–২টি ডিম সেদ্ধ বা হালকা রান্না করে খাওয়া স্বাস্থ্যকর হতে পারে এবং এটি ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে কাজ করে।
৪. আলু (Potatoes)
আলুকে প্রায়ই উচ্চ কার্বোহাইড্রেটের জন্য “ওজন বাড়ানোর খাবার” বলা হয়। কিন্তু চমকপ্রদ সত্য হলো, আলুর কিছু উপাদান ওজন কমাতে সাহায্য করে।
আলুতে থাকে রেজিস্ট্যান্ট স্টার্চ। এই ধরনের স্টার্চ হজমে প্রতিরোধ করে, ফলে ধীরে ধীরে শক্তি দেয় এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ করে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, আলু খাওয়া স্বল্প সময়ের মধ্যে ক্ষুধা কমায় এবং খাবারের পরিমাণ হ্রাস করে।
যদি আলুর সঙ্গে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার যেমন ডাল, ডিম, দুধজাত খাবার বা মুরগি খাওয়া হয়, তাহলে আরও বেশি সময় পেট ভরা থাকে। এটি অনেকের জন্য বাস্তবিক ওজন কমানোর সহজ উপায় হতে পারে।
উপসংহার: আলু ভাজা না করে সেদ্ধ, বেক বা কম তেলে রান্না করে প্রোটিনের সঙ্গে খেলে এটি স্বাস্থ্যকর ও ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে কার্যকর হতে পারে।
৫. পপকর্ন (Popcorn)
অনেকেই পপকর্নকে অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাক মনে করেন, কিন্তু এটি ফাইবারসমৃদ্ধ, কম ক্যালরির এবং একটি সম্পূর্ণ শস্য।
১ কাপ এয়ার-পপড পপকর্নে থাকে:
- মাত্র ৩০ ক্যালরি
- ১ গ্রাম ফাইবার
এটি ক্রাঞ্চি, তৃপ্তিদায়ক এবং কম ক্যালরির কারণে স্ন্যাক হিসেবে দারুণ।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা লো-ফ্যাট পপকর্ন খেয়েছেন, তারা চিপস খাওয়া লোকদের তুলনায় কম ক্ষুধার্ত অনুভব করেছেন এবং মোট খাবারও কম খেয়েছেন।
তবে সতর্ক থাকতে হবে—মাখন, ক্যারামেল বা চকলেটের মতো টপিংস দিলে ক্যালরি এবং ফ্যাট বেড়ে যায়, যা ওজন কমানোর পথে বাধা হতে পারে।
উপসংহার: বাড়তি স্বাদ যোগ না করে সাদাসিধা এয়ার-পপড পপকর্ন খাওয়া ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে দারুণ কাজ করতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)
১. ফুল-ফ্যাট দুধ খেলে কি ওজন বাড়ে?
না, গবেষণায় দেখা গেছে ফুল-ফ্যাট দুধ ওজন বাড়ায় না যদি পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ থাকে। বরং এটি তৃপ্তি বাড়ায় এবং খাবারের আকাঙ্ক্ষা কমায়—যা ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে কাজ করে।
২. প্রতিদিন ডিম খাওয়া কি নিরাপদ?
হ্যাঁ, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা প্রতিদিন ১–২টি ডিম খেতে পারেন। এতে প্রোটিন বেশি থাকে এবং এটি ওজন কমানোর সহজ উপায় হতে পারে।
৩. আলু কি ওজন বাড়ায় না কমায়?
আলু ভাজা বা তেলে রান্না করলে ওজন বাড়াতে পারে। কিন্তু সেদ্ধ বা বেকড আলু এবং প্রোটিনের সঙ্গে খেলে ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে।
৪. পপকর্ন কি ওজন কমাতে সাহায্য করে?
এয়ার-পপড পপকর্ন কম ক্যালরির ও ফাইবারসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি ক্ষুধা কমাতে সাহায্য করে। তাই এটি ওজন কমানোর সহজ উপায় হতে পারে।
৫. ওজন কমাতে কি কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ দিতে হবে?
না, কার্বোহাইড্রেট একেবারে বাদ দেওয়ার দরকার নেই। বরং ব্রাউন রাইস, কুইনোয়া বা ওটসের মতো সম্পূর্ণ শস্য বেছে নেওয়া উচিত—এটি একটি ওজন কমানোর সহজ উপায়।
৬. ওজন কমানোর জন্য দুগ্ধজাত খাবার কীভাবে খাবেন?
দই, দুধ বা চিজ পরিমাণমতো খেতে পারেন। এগুলো প্রোটিন সরবরাহ করে এবং তৃপ্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে—যা ওজন কমানোর সহজ উপায়।
৭. ওজন কমাতে এই খাবারগুলো কতদিন খেতে হবে?
ওজন কমানো নির্ভর করে ধারাবাহিকভাবে স্বাস্থ্যকর খাওয়া ও নিয়মিত ব্যায়ামের ওপর। এই খাবারগুলো দীর্ঘমেয়াদী ডায়েটে রাখা ভালো এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী ওজন কমানোর সহজ উপায়।
আমাদের বিশেষজ্ঞের মতামত
অনেক সময় আমরা ভাবি যে কিছু খাবার ওজন কমানোর জন্য খারাপ, কিন্তু সবসময় তা সত্য নয়। আলু, পপকর্ন, ডিম, ফুল-ফ্যাট দুধ এবং সম্পূর্ণ শস্য—সবই পরিমাণমতো এবং স্বাস্থ্যকরভাবে খেলে ওজন কমানোর সহজ উপায় হিসেবে কাজে লাগতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মনে রাখা যে একটি খাবারই আপনার ডায়েটকে নষ্ট বা সফল করতে পারে না। পুরো ডায়েটকে সামগ্রিকভাবে দেখুন এবং ফাইবার ও প্রোটিনসমৃদ্ধ বিভিন্ন প্রকারের খাবার অন্তর্ভুক্ত করুন যাতে পেট ভরা থাকে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায়। এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই একটি ওজন কমানোর সহজ উপায়।